৩৭৫ সিসি পর্যন্ত আমদানী অনুমোদনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

This page was last updated on 08-Jun-2026 11:44am , By Arif Raihan Opu

বাংলাদেশে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির পথ উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ২০২৬-২০২৯ আমদানি নীতিতে এ বিষয়ে নতুন বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে দেশের মোটরসাইকেল শিল্পে নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

৩৭৫ সিসি পর্যন্ত আমদানী অনুমোদন

৩৭৫ সিসি পর্যন্ত আমদানী অনুমোদন

বর্তমানে দেশে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল কমপ্লিট বিল্ড ইউনিট (সিবিইউ) অবস্থায় আমদানির সুযোগ রয়েছে। এর বেশি ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানি করা যায় না।

তবে ৫০০ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল দেশে উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানি ও সংযোজনের (সিকেডি) অনুমতি রয়েছে। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে বিদেশ থেকে সরাসরি ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত সিবিইউ মোটরসাইকেল আমদানি করা সম্ভব হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে প্রস্তাবিত নীতিমালায় ৩৭৫ সিসির বেশি ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল আমদানি নিষিদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে এই সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য হবে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়ে নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে সেইসব প্রতিষ্ঠান যাদের দেশে উৎপাদন বা সংযোজন কারখানা নেই। তারা সরাসরি বিদেশ থেকে উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল আমদানি করে বাজারজাত করতে পারবে। এর ফলে বাজারে নতুন ব্র্যান্ডের উপস্থিতি বাড়তে পারে এবং ভোক্তারা আরও বেশি বিকল্প পাবেন।

তবে এই সুযোগের বিপরীতে বেশ কিছু উদ্বেগও রয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন সিবিইউ আমদানির সুযোগ বাড়লে দেশে ইতোমধ্যে স্থাপিত মোটরসাইকেল কারখানাগুলো প্রতিযোগিতামূলক চাপে পড়বে।

আরও পড়ুনঃ খুব সহজেই ঢাকায় AI ট্রাফিক ক্যামেরার মামলা ও জরিমানা এড়িয়ে চলতে পারবেন যেভাবে

কারণ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা সংযোজনের মাধ্যমে বাজারে আসা মোটরসাইকেলের সঙ্গে সরাসরি আমদানিকৃত মডেলের প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।

আরও একটি বড় উদ্বেগ হলো মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থান। স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে যেসব শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে, সিবিইউ আমদানি বৃদ্ধি পেলে সেই খাতের প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে দেশে উৎপাদনের পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ রয়েছে, মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে আন্ডার-ইনভয়েসিং বা প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখানোর প্রবণতা আগে থেকেই রয়েছে। উচ্চ সিসির মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ বাড়লে এ ধরনের অনিয়ম আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা সরকারের রাজস্ব আহরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহৃত অধিকাংশ মোটরসাইকেল ১৬৫ সিসির মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে বাজারে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালার পর দেশে প্রায় ১০টি নতুন উৎপাদন ও সংযোজন কারখানা গড়ে উঠেছে।

জাপান ও ভারতের একাধিক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বর্তমানে বাংলাদেশেই মোটরসাইকেল উৎপাদন বা সংযোজন করছে। এসব বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।

উদ্যোক্তাদের দাবি সরকারের শিল্পনীতি ও বিনিয়োগ নীতির ওপর আস্থা রেখেই তারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। 

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবরে সরকার দেশে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি দেয়। তবে তখন শর্ত ছিল এসব মোটরসাইকেল দেশের ভেতরেই উৎপাদিত হতে হবে। সেই সিদ্ধান্তের আড়াই বছরেরও বেশি সময় পর এখন সরাসরি আমদানির সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশে বেশ কিছু চাইনিজ মোটরসাইকেল ব্র্যান্ডের অকাল পতন - কারণ ও প্রতিকার

এদিকে দেশের মোটরসাইকেল বাজারও বর্তমানে প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারছে না। ২০১৮ সালের শিল্প উন্নয়ন নীতিমালায় ২০২৭ সালের মধ্যে বছরে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে বার্ষিক বিক্রি ৫ লাখ ইউনিটেরও নিচে রয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যখন বাজারের প্রবৃদ্ধি মন্থর এবং বিদ্যমান বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত মুনাফা পাচ্ছেন না তখন নতুন নীতিগত পরিবর্তন কতটা প্রয়োজনীয়।

তাদের মতে খাতভিত্তিক নীতিনির্ধারণে স্বল্পমেয়াদি সুবিধার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সুরক্ষার বিষয়গুলোকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

৩৭৫ সিসির সিবিইউ মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে নাকি স্থানীয় শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে সেটিই এখন দেখার বিষয়।

বাইক বিষয়ক সকল তথ্য ও আপডেট এর জন্য বাইকবিডির সাথেই থাকুন।