মোটরসাইকেলের উপর অগ্রিম আয়করের প্রস্তাবনা - যৌক্তিকতা কতটুকু?
This page was last updated on 19-May-2026 10:09am , By Badhan Roy
বাংলাদেশে মোটরসাইকেল এখন আর শুধুমাত্র শখের বাহন নয়। যানজট পেরিয়ে সময়মতো অফিসে পৌঁছানো, জেলা শহরে ব্যবসার কাজে যাতায়াত কিংবা অনলাইনে খাবার ও ডেলিভারি সব ক্ষেত্রেই মোটরসাইকেল এখন প্রয়োজনের অংশ। এমন বাস্তবতায় মোটরসাইকেলের ওপর নতুন করে অগ্রিম আয়কর (AIT) আরোপের প্রস্তাব অনেকের কাছেই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
মোটরসাইকেলের আগ্রিম আয়করের প্রস্তাবনার যৌক্তিকতা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী বাজেটে নির্দিষ্ট সিসির মোটরসাইকেলের ওপর বার্ষিক অগ্রিম আয়কর আরোপের চিন্তা করছে বলে আলোচনা চলছে। যদিও সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি তবু বিষয়টি নিয়ে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী ও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।


মোটরসাইকেল কি এখনও বিলাসপণ্য?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মোটরসাইকেলের ব্যবহার গত এক দশকে বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় মোটরসাইকেলকে ব্যক্তিগত শখের বাহন হিসেবে দেখা হলেও এখন এটি প্রয়োজনীয় যাতায়াতের মাধ্যম।
বিশেষ করে রাজধানী ও বড় শহরগুলোতে গণপরিবহনের সীমাবদ্ধতা, দীর্ঘ যানজট এবং সময় সংকটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার বেড়েছে। একই সঙ্গে রাইড শেয়ারিং, কুরিয়ার ও ডেলিভারি সার্ভিস সম্প্রসারণে মোটরসাইকেল হয়ে উঠেছে আয়ের উৎস।
এ অবস্থায় মোটরসাইকেলের ওপর নতুন কর আরোপকে অনেকেই সাধারণ ব্যবহারকারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ হিসেবে দেখছেন।

বাইকের দামে আগেই রয়েছে একাধিক কর
দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের দাম দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় তুলনামূলক বেশি। কারণ বাইক কেনার সময় একজন ক্রেতাকে শুধু মূল দামই দিতে হয় না, এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন শুল্ক, ভ্যাট, রেজিস্ট্রেশন ফি ও অন্যান্য চার্জ।
একটি মোটরসাইকেল রাস্তায় নামানোর পূর্বে ব্যবহারকারীকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ কর ও ফি হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। পরে জ্বালানি, স্পেয়ার পার্টস ও সার্ভিস সেবা গ্রহনের ক্ষেত্রেও পরোক্ষভাবে ভ্যাট ও কর প্রদান করতে হয়।
এ অবস্থায় নতুন করে বার্ষিক আয়কর যুক্ত হলে সেটি মধ্যবিত্ত মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১২৫ বা ১৬০ সিসির বাইক কারা ব্যবহার করেন?
বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রিত সেগমেন্ট ১২৫ থেকে ১৬০ সিসি। এই শ্রেণির বাইক সাধারণত চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও রাইড শেয়ার চালকেরা ব্যবহার করেন।
অনেকের মতে এই ধরনের বাইককে উচ্চ আয়ের মানুষের বাহন হিসেবে বিবেচনা করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ দেশের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন সময় ও পরিবহন ব্যয় কমানোর জন্য। বিশেষ করে যারা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত কর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রভাব পড়তে পারে মোটরসাইকেল শিল্প খাতেও
দেশে গত কয়েক বছরে মোটরসাইকেল শিল্পে স্থানীয় বিনিয়োগ বেড়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দেশে অ্যাসেম্বলি ও সম্পূর্ণ উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। এর সঙ্গে তৈরি হয়েছে ডিলারশিপ, সার্ভিস সেন্টার ও অন্যান্য খাতে কর্মসংস্থান।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন মোটরসাইকেল এর উপর কর আরোপের কারণে মোটরসাইকেলের চাহিদা কমে যেতে পারে। এর প্রভাব পুরো শিল্প খাতে পড়বে। অর্থনৈতিক চাপের এই সময়ে ক্রেতারা নতুন বাইক কেনা থেকে আরও নিরুৎসাহিত হতে পারেন যা শিল্প উৎপাদন, রাজস্ব সংগ্রহ, কর্মী ছাটাই ইত্যাদি সমস্যা বয়ে আনতে পারে।
কর ব্যবস্থায় ভারসাম্য প্রয়োজন
নাগরিক হিসেবে এটাও অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য কর আদায় জরুরী। তবে কর কাঠামো এমন হওয়া দরকার যা নাগরিকের বাস্তব জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই তুলনায় ইতিমধ্যেই আমরা উচ্চমূল্যে দৈনন্দিন জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় একটা বাহন কিনছি এবং প্রতি ২ বছর অন্তর রোড ট্যাক্স দিচ্ছি।
তাই সরকারের উচিত এই খাতে নতুন কর আরোপের আগে ব্যবহারকারীদের আর্থিক অবস্থা, শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক সামাজিক প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া। অন্যথায় যেটি মানুষের চলাচল সহজ করেছে সেটিই আবার নতুন আর্থিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং একই সাথে শিল্প ও বিপুল কর্মসংস্থানের জন্য ক্ষতির কারন হতে পারে।
আমরা আশাবাদী, সরকার সাধারণ মানুষের কথা ভেবে এই প্রস্তাবিত বাড়তি করের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।
বাইক বিষয়ক সকল তথ্য ও আপডেট এর জন্য বাইকবিডির সাথেই থাকুন।