সিটি রাইডে দুর্ঘটনা এড়াতে যেসকল সতর্কতা মেনে চলতে হবে

“রাইড”শব্দটার সাথে আমরা বাইকাররা খুব পরিচিত। রাইডিং প্রধানত দুই ধরনের হয়ে থাকে, একটা হচ্ছে সিটি রাইড এবং অপরটি হচ্ছে হাইওয়ে রাইড। আজ আমরা আলোচনা করবো সিটি রাইডের সতর্কতা নিয়ে।

একজন বাইকার যখন তার বাইকটি নিয়ে হাইওয়ে যান তখন তিনি খুব বেশি সচেতন থাকেন নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। কিন্তু, যখন তিনি নিজের এলাকায় রাইড করে থাকেন তখন নিজের অজান্তেই বেশ কিছু ভুল করে থাকেন, যার ফলে ঘটে যায় নানান দূর্ঘটনা। এসকল  যার ভয়াবহতা হাইওয়ে থেকে কোন অংশে কম না।

ঢাকা শহরে বাইক রাইডিং

মোটরসাইকেল সিটি রাইডেব সতর্কতা

এই ক্ষেত্রে ঢাকা সিটি কিছুটা ব্যতিক্রম। নিজের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অথবা পুলিশের মামলার ভয়েই হোক, বাইকাররা বেশ সচেতন এই নগরীতে। তাই যান্ত্রিক নগরী হওয়ার পরে এখানে বাইক এক্সিডেন্ট এর সংখ্যা অন্য জেলার থেকে অনেকটাই কম।

আজ আমার আলোচনার বিষয় জেলা শহরের বাইকারদের কিছু ছোট ছোট অবহেলা নিয়ে,যা তাদের জীবনে বয়ে আনে মারাত্মক সব দূর্ঘটনা। চলুন তাহলে শুরু করা যাক।

১- হেলমেট ব্যবহারে অনীহা থাকাঃ

অধিকাংশ জেলা শহরগুলোতে দেখা যায় বাইকাররা হেলমেট একদম ব্যবহার করেন না। আর যদিও কেউ ব্যবহার করে থাকে তাকে নিয়ে নানা হাসিঠাট্টা করা হয়। এর ফলে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক বাইকার নিহত হন। এখনো আমাদের সমাজের অনেকের ধারণা নিজ এলাকায় হেলমেট লাগে না। কিন্তু এক্সিডেন্ট কখনো এলাকা দেখে হয় না এটা আমরা সবাই জানি তবুও একটু অবহেলা করে নিজেরাই নিজেদের ঝুকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়।

২- সঠিক সময়ে সংকেত বাতি ব্যবহার না করাঃ

“এটা তো আমার এলাকা”এই চিন্তা থেকেই শুরু হলো দূর্ঘটনার প্রথম ধাপ,অতিরিক্ত আত্নবিশ্নাসে নিজের এলাকায় অধিকাংশ মানুষ ই কোন সিগনাল ব্যবহার করে না,যার ফলে ঘটে যায় বড় বড় একটা দূর্ঘটনা।নিজের উপর আত্নবিশ্বাস থাকা খুব ভালো কিন্তু রাস্তায় নেমে যে কোন কাজ করার আগে একটু চিন্তা করা উচিৎ।

আপনি একটু চিন্তা করে দেখুন তো আপনার বাসার সামনের মোড়ে আপনি সতর্ক বাতি ব্যবহার করেন কিনা?

৩- হর্নের সঠিক ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকাঃ

যখন অনেক বন্ধু মিলে বাইক নিয়ে বের হয়ে থাকেন তখন কারন অকারণে হর্ন বাজিয়ে থাকেন,কিন্তু নিজের এলাকার কোন মোড়ে হর্ণ বাজাতে খেয়াল থাকে না কারন আপনি জানেন সামনের মোড়টি ফাকা থাকে অধিকাংশ সময়।  কিন্তু আপনি কি সিউর আপনি যখন যাচ্ছেন তখন সামনে কেউ আসছে না সামনে থেকে? এর ফলে প্রতিনিয়ত ঘটে যাচ্ছে মারাত্মক সব দূর্ঘটনা।

৪-অতিরিক্ত আত্নবিশ্বাসী থাকাঃ

নিজের বাসার সামনে রাস্তাটা সবার কাছেই খুব আত্নবিশ্বাসের জায়গা। কারন ওই রাস্তাটা আপনার চাইতে ভালো কেউ চেনে না। বাসা থেকে ফুল থ্রটল দিয়ে ডানে বামে না দেখেই বের হয়ে যাওয়া জেলা শহরগুলোর এক্সিডেন্টের অন্যতম আরেকটি প্রধান কারন। সড়ক সবার হয়তো আপনি আপনার এলাকার সড়কটিকে খুব ভালো ভাবে চিনেন কিন্তু রাস্তায় এমন রাইডার অথবা ড্রাইভার ও থাকতে পারে যারা ওই সড়কটিতে প্রথম গিয়েছে।

riding in heavy traffic

৫- ইঞ্জিন চালিত রিক্সা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান না করাঃ

জেলা শহরগুলোতে সবচেয়ে বড় আতংকের নাম অটোরিক্সা। প্রতি বছর কত বাইকার অটোরিক্সার জন্য আহত হন এটা আমরা নিজেও জানি না। দ্রুত গতিতে কোন হর্ন ব্যবহার না করে অটোরিকশার পাশ দিয়ে ওভারটেক করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে কোন না কোন দূর্ঘটনা।

৬- বাইপাস সড়কের অপব্যবহারঃ

আমাদের দেশ এখন বেশ উন্নত,তাই প্রতিটা জেলার মাঝেই একটা সড়ক থাকে যা অসাধারণ বেশ ভালো কথা এটা। এটা দোষের কিছু না। কিন্তু দোষ তখনি, যখন আমরা সড়কটাকে লাশের মিছিলে রূপান্তরিত করি। জেলা শহরে আমরা অধিকাংশ বাইকাররাই হেলমেট পড়ি না, তার মধ্যে কয়েকজন বন্ধু বা ভাই ব্রাদার এক হলেই শুরু হয় ভালো একটা রাস্তার সন্ধান,আর রাস্তা পেলেই শুরু হয়ে যায় বাইকের টপ চেক করার প্রবনতা, ঘটে যায় দূর্ঘটনা। একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে আপনিও এমন বাস্তবতা দেখবেন আপনার শহরেই।

মোটরসাইকেল ট্যুরিং টিপস এর ভিডিও

৭- অভিভাবকদের ভুল সিদ্ধান্তঃ

জেলা শহরগুলোতে প্রায় দেখা যায় অপ্রাপ্ত বয়স্ক একজন তরুণ একটা স্পোর্টস বাইক নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। আপনার আশেপাশে ও  এমন অনেক বাচ্চা আছে। আমি এদেরকে বাচ্চাই বলবো। একজন বাচ্চার হাতে যখন স্পোর্টস বাইক থাকবে তখন সেটা নিয়ে দূর্ঘটনা ঘটানোটা স্বাভাবিক ব্যাপার। সঠিক বয়স মানুষকে অনেক কিছুই আপনা আপনি শিখিয়ে দেয়।

৮- সঠিক লেন ব্যবহার না করাঃ

কমন একটা সমস্যা যেটা সব জায়গায় লক্ষ করা যায়। ফাকা রাস্তা পাওয়া মাত্রই রং সাইড দিয়ে টান দিয়ে বের হয়ে যাওয়ার প্রবণতা যেটি প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছে সব বড় বড় দূর্ঘটনা।

৯- অতিরিক্ত আরোহী বহন করাঃ

বাইকে তিনজন কোন কোন ক্ষেত্রে তিনের অধিক ও থাকে,এটা অধিকাংশ জেলা শহরগুলোতে চোখে পরে থাকে। বাইক কখনো দুই এর অধিক মানুষের জন্য নিরাপদ বাহন না। আর এই অতিরিক্ত আরোহী নিয়ে রাইডের ফলে বাইক খুব সহজেই হারিয়ে ফেলে নিজের নিয়ন্ত্রণ।

সতর্কতা

বাইকারদের ভুলগুলো তো জানতে পারলাম, এবার সিটি রাইডের দূর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতার কিছুটা সমাধান করা যাক –

১- হেলমেটের সঠিক ব্যবহারঃ

বাইক স্টার্ট দেয়ার আগে হেলমেটটা মাথায় পড়ে নিন,আর হেলমেটটা লক করে নিন,তারপর বাইক চালু করুন। এলাকার লোক আপনাকে কি বললো সে কথাগুলোয় কান কান না দিয়ে আপনার এলাকার বাইকারদের আপনি ভালো কিছু শিক্ষা দিন,একটা সময় দেখতে পাবেন আপনার দেখাদেখি আরেক জন তার দেখাদেখি আরেকজন এবাবে আপনার পুরো জেলার বাইকাররাই একটা সময় হেল্মেট ব্যবহার করবে। আর এক্সিডেন্ট হলে ঝুকি কমে যাবে অনেকাংশে।

২- সতর্ক বাতি ব্যবহার করাঃ

রাস্তা আমার বাসার সামনে হোক অথবা পুরা ফাকা হোক, সংকেত বাতি ব্যবহার করুন,ফাকা রাস্তায় গাড়ি আসতে সময় লাগে না।তাই সংকেত বাতির সঠিক ব্যবহার খুব জরুরী।

৩- হর্ণের ব্যবহার করাঃ

যে কোন মোড় অতিক্রম করার সময় হর্ণের সঠিক ব্যবহার করুন, রাতের বেলা হলে প্যাচ লাইট ব্যবহার করুন।

৪- অতিরিক্ত আত্নবিশ্বাস পরিহার করুনঃ

নিজের উপর আস্থাশীল থাকুন কিন্তু তা অতিরিক্ত মাত্রায় না,আপনার ওভার কনফিডেন্স আপনাকে বড় বিপদে ফেলতে পারে।

৫- ইঞ্জিন চালিত রিক্সা থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকুনঃ

যেহেতু এটা জেলা শহরের প্রধান সমস্যা।ওদেরকে মারধর করে বা অটোরিকশা ভেংগে এর সমাধান করা সম্ভব না।তাই এদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করুন। অটোরিক্সার পাশ দিয়ে ওভারটেক করার সময় বাইকের গতি কমিয়ে জোড়ে হর্ণ দিয়ে ওভারটেক করুন।

৬- বাইকপাস সড়কের অপব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুনঃ

ভালো রাস্তাগুলোর অপব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।বন্ধুরা মিলে ঘুরতে গেলেও রেসের ট্রাকে রাস্তাকে পরিনত করবেন না।আর যদি কিছুটা স্পীডে বাইক চালাতে মন চায় তাহলে হেল্মেট আর সেফটি গার্ড পরে নিন।

motorcycle city riding

৭- পারিবারিক সচেতনতাঃ

পারিবারিক সচেতনতা খুব গুরুরপূর্ণ একটা বিষয়। আপনার সন্তানের হাতে বাইকের চাবি তুলে দেয়ার আগে তাকে ভালোমতো বাইক চালানোর শিক্ষাটা দিয়ে নিন।তাকে বাইকের ভালো এবং খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে জানান।

৮- আইন ব্যবস্থার সঠিক মোতায়েনঃ

একটা এলাকার আইন অনেক কিছুই করতে পারে আইন যাতে সঠিক ভাবে প্রয়োগ হয় সেদিকে খেয়াল রাখুন।

৯- সঠিক রুট ব্যবহার করাঃ

সুযোগ পেলে রং সাইড দিয়ে যানবাহন চালানোর প্রবনতা মাথা থেকে মুছে ফেলি। তাহলেই দূর্ঘটনা অনেক কমে যাবে।

১০- অতিরিক্ত আরোহী বহন থেকে দূরে থাকাঃ

বাইকে দুইজনে বেশি কখনো উঠবেন না।

সম্পূর্ণ লেখাটি বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে লেখা,যে ঘটনাগুলো প্রতিনিয়ত ঘটেছে চোখের সামনে,   সামান্য কিছু নিয়ম মেনে চললে হয়তো সড়ক দূর্ঘটনা একেবারে থেমে যাবে না,কিন্তু অনেক কমে যাবে।

আশিক মাহমুদ

About আহমেদ স্বজন

shazon.bikebd@gmail.com'

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*