মোটরসাইকেলের গিয়ার শিফটিং এর বেসিক থেকে এডভান্স

বেশীরভাগ মোটরসাইকেল চালকের কাছে প্রথমে গিয়ার চেঞ্জ করা বা ভালভাবে গিয়ার শিফট করে বাইক রান করানোটা অনেক কষ্টের কাজ হয়ে দাড়ায় । অনেকে এই কারণে মোটর বাইকের পরিবর্তে একটা গিয়ারলেস স্কুটার চালাতেই বেশী পছন্দ করেন । অনেকে গিয়ার বিহীন বা অটোমেটিক গিয়ারযুক্ত বাইক রাইডিং এর কমফোর্ট ফিল করেন ।

কিন্তু , আসল কথা হল , যদি বাইকের ক্লাচ , পিকআপ , এবং গিয়ার সম্পর্কে হালকা একটু জানা যায় এবং প্রাকটিস করা যায় তাহলে এর মত সহজ কাজ মনে হয় আর নেই ।

file

আজ বাইকের গিয়র শিফটিং এর উপর একটা বিস্তারিত আলোচনা করব এবং এটা যারা নতুন বাইক কিনেছেন বা নতুন রাইডার এদের জন্য খুবই উপকারী ।

বেসিক :

গিয়ার সম্পর্কে জানতে হলে আগে আমাদের একটু বেসিক কিছু জিনিস জানতে হবে । সেগুলো জানলে গিয়ার শিফটিং আপনার কাছে অনেক সহজ হয়ে যাবে ।

Throttle – ইন্জিন চালাতে সহায়তা করে ।
Clutch – এটা আস্তে আস্তে ছেড়ে দিলে বাইক চলতে শুরু করে এবং এটা ধরে রাখলে বাইকের ইন্জিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় । অর্থাৎ , ইন্জিন আর কোন কাজ করে না ।
Gear Shifter – নাম অনুসারে , আপনি আপনার চয়েজ অনুযায়ী গিয়ার কমাতে বা বাড়াতে পারেন ।

এই থ্রোটল , ক্লাচ ও গিয়ার সম্পর্কে বেসিকটা আপনার এখন জেনে ফেলেছেন । এখন আসুন দেখে নেওয়া যাক কীভাবে এদের ব্যাবহার করতে হয় । আমি ধরে নিলাম আপনার বাইকটি জাস্ট স্টার্ট হয়ে নিউট্রাল অবস্থায় আছে এবং কোন গিয়ার এ নেই । তাহলে আপনি একন ক্লাচ টি আস্তে করে আপনার দিকে টেনে ধরুন এবং প্রথম গিয়ারটি চালু করুন । এরপর আপনার হাতের ক্লাচটি আস্তে আস্তে ছেড়ে দিতে থাকুন এবং সমান্তরালভাবে অপরদিকে থ্রোটলটি বাড়াতে থাকুন ।

এর ফলে আপনার বাইকটিকে আস্তে আস্তে স্মুথলি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে অর্থাৎ চলতে শুরু করবে । কিন্তু , এই কাজে যদি আপনি থ্রোটল বেশী দিয়ে ফেলেন বা ক্লাস একবারেই ছেড়ে দেন , তাহলে বাইকের ইন্জিনের একটা বাজে শব্দ হয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে । থ্রোটল আপ করা ও তার সাথে সমান্তরালে ক্লাচ রিলিজ করাটা খুবই ভালভাবে আয়ত্ত করা দরকার । না হলে আপনি যদি এর কোনটাতে ভুল করেন , তাহলে আপনার বাইকের ইন্জিনের ক্ষতি সহ এক্সিডেন্টের সম্ভাবনা আছে । তাই , বেশ মনোযোগের সাথে প্রাকটিস করুন এই বিষয়টা এবং আয়ত্ত করে ফেলুন ।

মাস্টারিং টেকনিক :

ধরে নিলাম , আপনি বেসিক টেকনিকগুলো ভালভাবে আয়ত্ত্ব করেছেন । এখন এটা ভালভাবে ইউজ করার পালা । নীচে যেসব বাইক এ্যভেইলএভল তার একটা চিত্র তুলে ধরা হল :

  • 6’th Gear (If applicable)
    • 5’th Gear
    • 4’th Gear
    • 3’rd Gear
    • 2’nd Gear
    • Neutral
    • 1’st Gear

বেশীরভাগ বাইক ম্যানুফ্যাকচার কোম্পানী উপরের গিয়ার প্যাটার্ণ অনুসরণ করে থাকে । আর যদি আপনার বাইকের অন্য কোন গিয়ার প্যাটার্ণ থাকে তবে তার সাথে একটু মানিয়ে নিতে হবে । বেশীরভাগ ১৫০ সিসির বাইকেই উপরের গিয়ার প্যাটার্ণ প্রোভাইড করে থাকে ।

যাই হোক , এবার আমরা ফিরে আসি আমাদের মূল বিষয় , মাস্টারিং গিয়ার শিফটিং । এর জন্য নীচের প্রসিডিউর গুলো ধীরে ধীরে ফলো করতে শুরু করুন :

  • বাইকের ক্লাচটা আপনার দিকে টেনে ধরুন ।
  • গিয়ারটা শিফট করুন , আপনি যে গিয়ারেই থাকেন না কেন ।
  • বাইকের থ্রোটল চালু করে ইন্জিনকে সামনে এগিয়ে যাবার শক্তি দিন ।
  • আপনার থ্রোটল বাড়াবার সাথে সাথে আস্তে আস্তে ক্লাচটা ছাড়তে থাকুন ।
  • থ্রোটল ও ক্লাচ দুটাই আস্তে আস্তে ছাড়তে থাকুন, বিষয়টা যেন একই সাথে এবং একই সময়ে হয় । এবার দেখতে পাবেন যে আপনার বাইকটি আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ।
  • বাইকটি যখন চলতে শুরু করবে তখন গতি বাড়াতে থ্রোটল বাড়াতে থাকুন এবং বাইক অতিরিক্ত শব্দ করার সাথে সাথে ২য় গিয়ারটি শিফট করুন ।

বিষয়টা হয়ত অনেক ডিটেইলসে বলে ফেললাম । আপনাদের অনেকের জন্য এত ডিটেইলস না লাগতেও ারে । তারা এটা স্কিপ করে যান । আর লিস্ট আকারে দেওয়া বলে অনেকের কাছে বিষয়টা কঠিনও মনে হতে পারে । কিন্তু , গোটা বিষয়টা আপনি একবার আয়ত্ত্ব করতে পারলেই বিষয়টা আপনার কাছে অত্যান্ত সহজ হয়ে যাবে । এটার জন্য আপনার দরকার ধৈর্য ও পরিশ্রম । প্রাকটিসের পাশাপাশি আপনাকে আপনার বাইকটিতে ফিল করতে হবে , মানে আপনার সাথে আপনার বাইকের একটা অটো কমিউনিকেশন টাইপের । আপনার বাইক কী বলছে সেটা আপনি বুঝবেন আবার আপনি কখন কী বলছেন সেটা আপনার বাইকও বুঝবে ।

এখন পরের গিয়ারগুলো ক্ষেত্রে কী করতে হবে ?:

প্রথম গিয়ার এর পরে গিয়ারগুলো শিফট করার জন্য আসলে নির্দিষ্ট কোন নিয়মকানুন নেই । এটা আপনাকে নিজে থেকে ফিল করে করতে হবে । আপনার ইন্জিনের সাউন্ড যখন দেখছেন অতিরিক্ত বেড়ে যাচ্ছে , তখন আস্তে করে আপনি গিয়ারটা চিঞ্জ করে দিতে পারেন । আর প্রতিটা গিয়ারের একটা পয়েন্ট আছে যার পরে বাইকের পিকআপ বাড়ালেও বাইক আর সেই গিয়ারে তার থেকে বেশী স্পীড তুলতে পারে না বা ইন্জিন আর বেশী পাওয়ার বা টর্ক ক্রিয়েট করতে পারে না ।

সেই লেভেলে চলে গেলে আপনি আপনার বাইকের গিয়ার চেঞ্জ করে দিতে পারেন । আর তখনও গিয়ার চেঞ্জ না করলে এটা আপনার বাইকের ইন্টারনাল পার্টস এর ক্ষতি করতে পারে । এখন , আপনাকে বুঝতে হবে ইন্জিনের এই রেভেলটা আসলে কখন আসে যখন এক্সেলেরেট কারর পরও ইন্জিন আর পাওয়ার উৎপন্ন করতে পারে না ।

আবার , খুব দ্রুত গিয়ার চেঞ্জ করাটাও খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় । এটার ফলে আপনার ইন্জিনের লাইফটাইম কমে যেতে পারে । আপনি যদি ইন্জিনের সর্বোচ্চ লেভেলে যাবার অনেক আগেই গিয়ার চেঞ্জ করতে থাকেন , তবে দেখা যাবে একসময় আপনার ইন্জিনের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে গেছে । তাই , সময় বুঝে সবসময় কাজ করতে হবে । আপনার বাইককে আপনাকে বুঝতে হবে । আর প্রাকটিসের কোন বিকল্প নেই ।

স্মুথলি গিয়ার শিফট করা :

প্রায় প্রত্যেক ব্যাক্তিই প্রথমবার গিয়ার শিফট করতে গিয়ে ঝামেলায় পড়েন । বেশীরভাগের ক্ষেত্রে যেটাহয়ে থাকে সেটা হল , হয় ক্লাচ দ্রুত ছেড়ে দেবার ফলে আপনার বাইকের স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায় , না হলে বাইক চলছে না দেখে আপনি যদি ক্রমাগতভাবে থ্রোটল বাড়াতে থাকেন , তাহলে বাইক এর সামনের চাকা উচু হয়ে বাইক জোরে ঝাড়ি মারতে পারে । তাই , গিয়ার শিফট করার সময় সবসময়ই ক্লাচ ও থ্রোটল একইসাথে ছাড়ার চেষ্টা করুন ও মনোযোগের সাথে করুন ।

ডাউনশিফট কীভাবে করব ?

গিয়ার ডাউনশিফটের সময় ক্লাচটি প্রথমে চেপে ধরুন এবং আপনি যে গিয়ারে যেতে চাইছেন সেই গিয়ারে শিফট করুন । এই সময় যে থ্রোটল এর পরিমাণও আপনার সিলেক্টেড গিয়ার অনুযায়ী কম থাকে । অর্থাৎ , আাপনি যে গিয়ারে শিফট করছন , সেই গিয়ারে সবোর্চ্চ যতটুকু থ্রোটল লাগে ততটুকু সবোর্চ্চ ততটুকু ধরুন । এরপর আস্তে আস্তে ক্লাচ ছেড়ে দিন । তবে ক্লাস টেনে ধরে রাখা অবস্থায় ব্রেক করবেন না । কারণ , আপনার বাইক যখন লো গিয়ারে চলে যায় তখন অটোমিটেকলে ইন্জিনের গতি সেই গিয়ারের লেভেলে চলে আসে । তখন একটা অটোমেটিক ব্রেকিং হয়ে যায় সেটাকে ইন্জিন ব্রেকিংও বলা হয় । পার্কিং করা :

বাইক পার্কিং করার সময় সাধারণ ভাবে বাইকটি নিউট্রাল করে ফেলুন । বাইকটি গিয়ারে থাকলে হয়তবা এটি একটু লাফ মারতে পারে । তাই , নিউট্রাল করাই বেটার । এরপর আপনি যেখানে বাইকটি রাখবেন সেখানে ভালভাবে রেখে দিন । তারপর এটার ১ম গিয়ার শিফট করিয়ে রাখুন । কারণ , ১ম গিয়ারে বাইকটি থাকলে এটার চাকা নড়াচড়া করার কোন অপশন থাকবে না । তাই , এই ট্রিকটি কাজে লাগাতে পারেন ।

যত দ্রুত আপনি এই টেকনিকটা আয়ত্ত্ব করতে পারবেন তত দ্রুত আপনার বাইক রাইডিং স্কিল বৃদ্ধি পাবে । হ্য্যাপী রাইডিং ফর অল ।

About শুভ্র সেন

সবাইকে শুভেচ্ছা । আমি শুভ্র,একজন বাইকপ্রেমী । ছোটবেলা থেকেই মোটরসাইকেলের প্রতি আমার তীব্র আগ্রহ রয়েছে । যখন আমি আমার বাড়ির আশেপাশে কোন মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পেতাম, আমি তৎক্ষণাৎ মোটরসাইকেলটি দেখার জন্য ছুটে যেতাম ।২ বছর ধরে গবেষণা ও পরিকল্পনার পর আমি এই ব্লগটি তৈরী করি । আমার লক্ষ্য হল বাইক ও বাইক চালানো সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেয়া । সবসময় নিরাপদে বাইক চালান । আপনার বাইক চালানো শুভ হোক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*