জিনান টি৬ মালিকানা রিভিউ – আশফাক আলম

আমি যখন ডিসিশন নিলাম যে আমি স্কুটার কিনবো তখন ইউটিউব এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুটার রিভিউ দেখা শুরু করলাম। প্রথমত ১২৫সিসির একটি ইন্ডিয়ান স্কুটার পছন্দ হয় যখন ডিসিশান মোটামুটি ফাইনাল তখন স্কুটারের শো-রুমে গিয়ে খোজ নিলাম স্কুটার আছে কিনা বা তাদের সুবিধা বা অসুবিধা বা সার্ভিস কেমন। দেখলাম তাদের ব্যবহার এবং কথা বার্তায় সুবিধার নয়। স্কুটার বিক্রির জন্য চাটুকারিতায় যা কথাবার্তা বলা দরকার তেমন আরকি। যাইহোক বাসায় চলে আসলাম। বাসায় এসে আবার ইউটিউব দেখা শুরু করলাম। হঠাৎ বাইকবিডি চ্যানেলে জিনান টি৬ স্কুটারের একটি রিভিউ চোখে পরল। এই রিভিউটাই আমাকে জিনান টি৬ কেনার জন্য আগ্রহী করে তুলেছে। আমি চাচ্ছিলাম যে এমন একটি…

Review Overview

User Rating: 4.7 ( 1 votes)

আমি যখন ডিসিশন নিলাম যে আমি স্কুটার কিনবো তখন ইউটিউব এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুটার রিভিউ দেখা শুরু করলাম। প্রথমত ১২৫সিসির একটি ইন্ডিয়ান স্কুটার পছন্দ হয় যখন ডিসিশান মোটামুটি ফাইনাল তখন স্কুটারের শো-রুমে গিয়ে খোজ নিলাম স্কুটার আছে কিনা বা তাদের সুবিধা বা অসুবিধা বা সার্ভিস কেমন। দেখলাম তাদের ব্যবহার এবং কথা বার্তায় সুবিধার নয়। স্কুটার বিক্রির জন্য চাটুকারিতায় যা কথাবার্তা বলা দরকার তেমন আরকি। যাইহোক বাসায় চলে আসলাম। বাসায় এসে আবার ইউটিউব দেখা শুরু করলাম। হঠাৎ বাইকবিডি চ্যানেলে জিনান টি৬ স্কুটারের একটি রিভিউ চোখে পরল।

জিনান টি৬

এই রিভিউটাই আমাকে জিনান টি৬ কেনার জন্য আগ্রহী করে তুলেছে। আমি চাচ্ছিলাম যে এমন একটি স্কুটার কিনব যার লুকস হবে একটু স্পোর্টি বাইকের মত। সিটিং পজিশন হবে একটু রিল্যাক্সড। এছাড়া আমি শুধু শহরেই না অনেক দূর দুরান্তে রাইড করতে পারব, আফটার সেলস সার্ভিস ভাল এবং কম দামে স্পেয়ার্স পার্টস পাওয়া যাবে। সব দিক বিবেচনা করে দেখলাম যে জিনান টি৬ আমার মনের মত। এত দিন আমি এই স্কুটারই খুজেছি। তারপর জিনানের অফিশিয়াল গ্রুপে জয়েন করলাম যারা টি৬ রাইড করছেন তাদের মতামত এবং জিনানের সেবার মান সম্পর্কে ধারনা পেলাম।

দীর্ঘ ৬ মাস অপেক্ষার পর ১৩ই ফেব্রুয়ারী ২০১৭ তে জিনানের তেজগাও শো-রুমে সকাল সকাল উপস্থিত হলাম। আগেই ফেসবুক গ্রুপে এবং জিনানের কর্নধার ফাসানি ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে স্কুটার শো-রুমে এসছে। শো-রুমে গিয়ে পছন্দ করলাম ১৫০সিসি এর ভার্সন।

জিনান টি৬ ছবি

স্কুটারটিতে জিওয়াই ৭ ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। স্কুটারটি লাল রং্যের। আর এর দাম পরেছে ১লাখ ৬৫ হাজার টাকা। কোন ভাবেই দাম কমানো পসিবল ছিল না। কারন এই লটের স্কুটার গুলোতে কাস্টমস সংক্রান্ত জটিলতা ছিল। তারপর দেখেশুনে একটা ফ্রেশ স্কুটার রেডি করতে বললাম। ১৫-২০মিনিটের মধ্যে স্কুটার রেডি হয়ে গেল এবং ততক্ষনে আমরা বাকি ফর্মালিটিস সম্পন্ন করলাম। ছোট একটা টেস্ট রাইডও দিলাম।

এরপর রওনা হলাম উত্তরার দিকে। এখানে বলে রাখা ভাল যে আমি আগে কখনো বাইক বা স্কুটার চালাইনি। আর সেই আমি একজন পিলিওয়ন নিয়ে উত্তরায় বাসায় আসি। বুঝতেই পারছেন স্কুটার খুব বেশি কঠিন কিছু নয়।

জিনান টি৬ মূল্য

এখন আসি জিনান টি৬ এর ফিচার্স গুলো কি কি সেগুলো আলোচনা করা যাক। প্রথমেই বলতে হয় স্কুটারটি ৪সেকেন্ডে ০ থেকে ৬০কিমি পর্যন্ত স্পীড তুলতে সক্ষম। এর স্পীড তোলার সক্ষমতা নিয়ে বলতে গেলে ১৫০সিসি সেগমেন্টের সেরা স্কুটার। স্কুটারটি ওজন হচ্ছে ১১৩ কেজি এবং আমি টপ স্পীড পেয়েছি ১০০কিমি প্রতি ঘন্টা। হয়ত আরো স্পীড উঠানো যেতো সেফটির জন্য উঠাইনি। এর রেডি পিক আপ খুবই ভাল। এত ভালো যে ব্রেক ইন পিরিওয়ডে ৪০কিমি তে রেখে চালানোটা খুবই কঠিন কারন পিক আপ দিলেই ৫০/৬০ অনায়াসে উঠে যায়। স্কুটারটির সামনে ডিস্ক ব্রেক এবং পিছনে ড্রাম ব্রেক হওয়ার কারনে ব্রেকিংটাও স্মুথ। তবে ড্রাম ব্রেকটা কিছুটা লুজ হয়ে যায়। এছাড়া ডুয়েল হাইড্রোলিক শক এবজর্ভার দেওয়ার কারনে ভাঙ্গা চুরা রাস্তায় তেমন ঝাকি অনুভব হয় না। জিনান টি৬ এর স্পীডমিটারটি এনালগ এবং অডোমিটারটি ডিজিটাল।

জিনান টি৬ এর ফুয়েল ট্যাঙ্কের ধারন ক্ষমতা হচ্ছে ৮লিটার। আমি সিটিতে মাইলেজ পেয়েছি ৩৩কিমি প্রতি লিটার এবং হাইওয়েতে মাইলেজ পেয়েছি ৩৫কিমি প্রতি লিটার। এছাড়া সিটের নিচে স্টোরেজে একটি ফুলফেস হেলমেট রাখা যায় এবং স্টোরেজের জায়গাও অনেক। সিটিং পজিশন বেশ রিল্যাক্সড। রাইডার ও পিলিওয়নের বাসার ব্যবস্থা অনেক আরামদায়ক। কারন পিছনে যিনি বসবেন তাকে নরমাল বাইকের মত পা রাখতে হয়না, পা একটু সামনের দিকে থাকে। যার কারনে লম্বা রাইড দিলেও সমস্যা হয়না। টি৬ এর লাইটিং সিস্টেমও অসাধারন। অন্যান্য স্কুটার থেকে এর লাইটিং বেশ ভাল। সামনে এবং পেছনের দিকে এলইডি লাইটস, ইন্ডিকেটর গুলোও এলইডি। এছাড়া ইন্ডিকেটর্স গুলো বডির সাথে এটাচড। তাই স্কুটার পরে গেলেও ইন্ডিকেটর্স এর কিছু হবে না।

জিনান টি৬ ইঞ্জিন

এর সামনের পার্কিং লাইট গুলো এর সৌন্দর্যকে কয়েক গুন বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এতে কোন পাস লাইট নেই। এর সামনে এবং পেছনে টিউবলেস টায়ার দেয়া হয়েছে। আমার পেছনের চাকা তিন বার লিক হয়েছে। প্রথম বারের পর জেল ভরে নিয়েছি। এর সিটে ছোট একটা ব্যাকরেস্ট আছে। জিনান টি৬ এ সিকিউরিটিরজন্য বিল্টইন সিকিউরিট লক দেওয়া আছে। যাতে কেউ টাচ করলেই এলার্ম বেজে উঠে। এর সাথে একটি রিমোট দেয়া হয় যাতে করে আপনি খুব সহজেই সিকিউরিটি লক/আনলক করতে পারেন।

স্কুটারটিতে বাইকের মত ঘাড় লক(স্টিয়ারিং লক) এবং কি শাটারের ব্যবস্থা আছে। তবে এর গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স কম। যার কারনে উচু স্পীড ব্রেকারে নিচের অংশ ঘষা লাগে।

জিনান টি৬ দাম

জিনান টি৬ বা স্কুটার কেনার একটা উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত হচ্ছে অফিসের যাতায়াত এর সাথে ছুটির দিনে বন্ধুবান্ধবদের সাথে একটু ঘোরাফেরা আর টুকিটাকি এদিক সেদিক যাওয়া আসা। মুল কথা হচ্ছে ঢাকা শহরে রিকশা ভাড়া এবং জ্যামের কারনে যে সময় ও অর্থ অপচয় হয় সেটাই বাচানো আমার মূল উদ্দেশ্য। টি৬ বহু অংশে আমার এই উদ্দেশ্য সফল করে যাচ্ছে। আর ইদানিং অনেকেই পাঠাও এবং উবারে স্কুটার ব্যবহার করার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যদিও এখনও কোন লম্বা ট্যুর দেয়ার সৌভাগ্য হয়নি, তবে সুযোগ পেলেই ট্যুর দেব।

এবার আসি মেইন্টেনেন্স এর ব্যাপারে। জিনান টি৬ এর মেইন্টেনেন্স তেমন হাই নয়। আমি গত  মাসে প্রায় ৪০৪১কিমি রাইড করেছি। স্কুটারটির ব্যালেন্স অসাধারন, তাছাড়া জিনানের দক্ষ টেকনিশিয়ানের পরামর্শের কারনে এখন পর্যন্ত কোন ধরনের দূর্ঘটনার কবলে পরিনি। প্রতি সপ্তাহের শুক্রবারে আমি শ্যাম্পু দিয়ে স্কুটারটি ওয়াস করি। মাসে দু বার চাকার হওয়া চেক করাই। এ পর্যন্ত পার্টস তেমন কোন পরিবর্তন করতে হয়নি। পিছনের চাকার বেয়ারিং দুবার চেঞ্জ করতে হয়েছে। এছাড়া আমার স্টক হর্নটা স্কুটার কেনার পর পরই চেঞ্জ করি। কারন স্টক হর্ন তেমন জোরাল বলে আমার মনে হয়নি।

জিনান টি৬ ডিজাইন

সার্ভিসিং এর ব্যাপারে বলতে গেলে জিনান থেকে একটি ম্যানুয়েল বুক দেওয়া হয় যেখানে কত কিমি পর পর সাভিসিং করতে হবে তা দেয়া থাকে। যদি বড় কোন সমস্যা না হয় তবে নিয়ম মোতাবেক সার্ভিস করালেই হয়। জিনানের সার্ভিসং সেন্টারের লোকজন অনেক আন্তরিক এবং টেকনিশিয়ানরাও অনেক দক্ষ। এছাড়া এমন ও শুনেছি যাদের স্কুটার রাস্তায় নষ্ট হয়েছে জিনানের সার্ভিসের লোকজন সেখানে গিয়ে সার্ভিস করে দিয়ে এসছে। যেকোন সমস্যায় আমি জিনানের টেকনিশিয়ানদের উপর আস্থা রাখতে পারি।

জিনানের আফটার সেল সার্ভিস অসাধারন। এখনও মবিল চেঞ্জ করার জন্য দু মাসে এক বার সার্ভিস সেন্টারে যেতে হয়। একটা কথা মনে রাখা ভাল বাইক স্কুটার বা মেশিনারিজ এক হাতে চালানো ভাল। আর একই সার্ভিস সেন্টারে থেকে সার্ভিসিং করা উচিত।

জিনান টি৬ রিভিউ

জিনান টি৬ এর পজেটিভ দিকঃ

  • এক্সেলারেশন, স্পীড এবং লুকস অসাধারন
  • স্পেয়ার্স পার্টস এভেইলেবল
  • আফটার সেল সার্ভিস

জিনান টি৬ এর নেগেটিভ দিকঃ

  • লম্বা সময় নিয়ে রাইড করলে ব্যাক পেইন হয়
  • সামনের দিকের ডিজাইনের কারনে একটু বড় তাই জ্যামের মধ্যে আটকে যেতে হয়
  • ইঞ্জিনের সাউন্ড একটু বেশি

জিনান টি৬ ইউজার রিভিউ

সব দিক বিবেচনা করলে নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা স্কুটারের মধ্যে জিনান টি৬ অন্যতম। বলা যায় যে অন্যান্য কোম্পানির স্কুটারের চেয়ে টি৬ অন্যতম সেরা স্কুটার। অনেকেই স্কুটারটিকে লেডিস বাইক। কিন্তু আমি টি৬ এর স্মুথনেস এবং পারফর্মেন্স এ অনেক মুগ্ধ। স্কুটার অনেক দেশেই বহুল ব্যবহৃত বাহন। এখানে ছেলে বা মেয়ে ব্যাপার নয়। আমাদের দেশেও আমরা উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে সবার মাঝে একটা ধারনা দিতে চাই যে স্কুটার সবার বাহন। আমাদের সবার চিন্তাধারতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তবেই পরিবর্তন আসবে। সবাই সেফলি রাইড করবেন। ধন্যবাদ।

About Arif Raihan opu

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*